Saturday 28th November 2020
আজ শনিবার | ২৮শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

এক রোগী থেকেই ফি আদায় ‘তিনশ কোটি টাকা’ ও শ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কিংবদন্তি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়

কৃষিবিদ জয়নাল হোসেন

রবিবার, ০২ আগস্ট ২০২০ | ১০:৩২ পূর্বাহ্ণ

এক রোগী থেকেই ফি আদায় ‘তিনশ কোটি টাকা’ ও শ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী কিংবদন্তি ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়
Spread the love

ভারতের ইতিহাসে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় এক স্মরণীয় ও বরণীয় নাম৷ তিনি ছিলেন কৃতী বিদ্যার্থী, প্রবাদপ্রতীম চিকিৎসক, যোগ্য অধ্যাপক, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র, বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য, সমাজ সেবক, শিক্ষাবিদ ও সফল মুখ্যমন্ত্রী৷ এককথায় তিনি এক কিংবদন্তি ব্যক্তিত্ব, যাঁকে নিয়ে দেশবাসীর গর্বের অন্ত নেই৷ তাঁর চারিত্রিক গুণাবলী দেশবাসীকে প্রতিনিয়ত
বিস্মিত, প্রাণিত ও উজ্জীবিত করে৷ ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় ছিলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী ও রাজ্যের প্রকৃত রূপকার।আর ডাক্তার হিসেবে তিনি ছিলেন সাক্ষাৎ ধ্বন্বন্তরি।
পিতার চাকরিস্থল বিহারের পাটনার বাঁকিপুরে(গঙ্গাতীরে আবাসিক এলাকা) ১৮৮২ সালের ১লা জুলাই বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম। তিনি ছিলেন পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় ও মা অঘোরকামিনী দেবীর পাঁচ সন্তানের মধ্যে সর্বকণিষ্ঠ। তৎকালীন ২৪ পরগনা জেলার অন্তর্গত মাইহাটির শ্রীপুর গ্রামে ১৮৫৬ সালে মা অঘোরকামিনী দেবীর জন্ম। মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর বিয়ে হয় উনিশ বছর বয়সের যুবক উত্তর ২৪ পরগনার টাকি-শ্রীপুরের প্রকাশচন্দ্র রায়ের সঙ্গে। প্রকাশচন্দ্র রায়ের আদি নিবাস ছিল বর্তমান বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলার দেবহাটা উপজেলার শ্রীপুর গ্রামে। বাংলাদেশের যশোহরের বারো ভুঁইঞার একজন রাজা প্রতাপাদিত্যের পরিবারের উত্তরপুরুষ ছিলেন প্রকাশচন্দ্র রায়।
সরকারি চাকরিজীবি প্রকাশচন্দ্র রায় ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত ছিলেন। প্রকাশচন্দ্র রায় ছিলেন তৎকালীন সরকারের এক্সাইজ বিভাগের ইন্সপেক্টর। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও নীতিবাদী মানুষ ছিলেন৷ পরবর্তী সময়ে প্রকাশচন্দ্র রায়ের চারিত্রিক দৃঢ়তা ও মাতা অঘোরকামিনী দেবীর কোমলতা বিধানচন্দ্র রায়ের চরিত্রে সন্নিবেশিত হয়েছিল৷ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন পাঁচটি নতুন উপশহর:
১. দূর্গাপুর(পশ্চিম বর্ধমান),
২. বিধাননগর( বা সল্টলেক, উত্তর ২৪ পরগনা),
৩. কল্যাণী(নদীয়া),
৪. অশোকনগর(বারাসাত, সদর মহকুমা, উত্তর ২৪ পরগনা) ও
৫. হাবরা(যশোর রোডে বারাসাত মহকুমা, উত্তর ২৪ পরগনা)।

ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের চৌদ্দ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়েছিল। এই কারণে তাঁকে পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের রূপকার হিসাবে অভিহিত করা হয়। তিনি নিখিল ভারত চিকিৎসক সমিতির সভাপতি ছিলেন। তিনি (১৯৬১ সালে) ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ভারতরত্নে ভূষিত হন। মৃত্যুর পর তাঁর সম্মানে কলকাতার উপনগরী সল্টলেকের নামকরণ করা হয় বিধাননগর। ১লা জুলাই তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিন সারা ভারতে ‘চিকিৎসক দিবস’ রূপে পালিত হয়।
তবে রাজনীতিতে এসে এতো কাজ ও ত্যাগ স্বীকার করার পরেও অনেকে তাঁর সমালোচনায় মুখর ছিলেন। তিনি জীবনে মদপান করেননি,ধূমপান করেননি, চারিত্রিক কোনো স্খলন তাঁর জীবনে ছিল না। বিধানচন্দ্র রায় যখন লাখ টাকার প্র্যাকটিস ছেড়ে দিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নিলেন তখন হাওড়া-কলকাতার দেওয়ালে দেওয়ালে কুৎসিত ভাষায় তাঁর নিন্দুকদের দ্বারা লেখা হল:
‘বাংলার কুলনারী হও সাবধান,
বাংলার মসনদে নলিনী বিধান।’
দেওয়ালে লেখা স্লোগানের ‘নলিনী’ মানে নলিনীরঞ্জন সরকার। নলিনীরঞ্জন সরকার (১৮৮২-১৯৫৩) ছিলেন অবিভক্ত বাংলার ফজলুল হক মন্ত্রী সভার অর্থ মন্ত্রী, ১৯৪১ সনে বড়লাটের কেন্দ্রিয় শাসন পরিষদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ভূমি দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং ১৯৪৩ সনে বাণিজ্য ও খাদ্য মন্ত্রী। তিনি ছিলেন অর্থনীতিবিদ, শিল্পপতি ও একজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলার অর্থনীতি ও রাজনীতির সঙ্গে ব্যাপকভাবে সক্রিয় ছিলেন। নলিনীরঞ্জন সরকার ১৮৮২ সালে বর্তমান বাংলাদেশের ময়মনসিংহ বিভাগের অন্তর্গত নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পৌরএলাকা সাজিউড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম চন্দ্রনাথ সরকার। নলিনীরঞ্জন সরকার ১৯০২ সালে ময়মনসিংহ সিটি স্কুল থেকে এন্ট্র্যান্স পাস করে ঢাকার জগন্নাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে দেশভাগের সময় নলিনীরঞ্জন সরকার ভারতবাসী হন। তিনি ভারতে গিয়ে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের ক্যাবিনেটের ফাইন্যান্স মিনিস্টিার হন। ময়মনসিংহ শহরের উত্তর প্রান্তে পুরাতন ব্রহ্মপুত্রনদের তীরে তাঁর বাড়িতে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন সংগ্রহশালা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বিধানচন্দ্র রায় পাটনার এক গ্রাম্য পাঠশালায় প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে প্রথমে সেখানকার টি.কে, ঘোষ ইনস্টিটিউশনে ও তারপর পাটনা কলিজিয়েট স্কুল ও কলেজে শিক্ষালাভ করেন৷ ১৮৯৬ সালে তাঁর মা অঘোরকামিনী দেবী মাত্র ৪০ বছর বয়সে মারা যান। তখন বিধান রায়ের বয়স কেবল চৌদ্দ। পরের বছর ১৮৯৭ সালে তিনি এন্ট্র্যান্স পাস করেন।কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৮৯৯ সালে এফ.এ এবং ১৯০১সালে পাটনা কলেজ থেকে অঙ্কশাস্ত্রে অনার্সসহ বি.এ ডিগ্রি লাভ করেন৷ শৈশব থেকেই বিধানচন্দ্র রায় অত্যন্ত বুদ্ধিমান, মেধাবী ও শ্রুতিধর ছিলেন৷ এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বিধানচন্দ্র রায়ের কোনোদিন কোন গৃহশিক্ষক ছিল না৷ অর্থাভাব, প্রতিকূলতা ও সংযমের মধ্যে দিয়েই তাঁকে চলতে হয়েছে৷তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর ঘরের সকল কাজ পাঁচ ভাইবোনেরা মিলেমিশেই করতেন। তাঁর ছিল দুবোন সুসর্বাসিনী ও সরোজিনী আর দুভাই সুবোধচন্দ্র রায় ও সাধন চন্দ্র রায়। বাবা নিজের কাজে প্রায়ই বাইরে থাকতেন বিধায় ঘরের কাজ ভাগাভাগি করে ভাইবোনদেরই করতে হতো। বি.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিধানচন্দ্র রায় কলকাতা মেডিকেল কলেজে ও শিবপুর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তির জন্য আবেদন করেন৷ একই দিনে দুটি কলেজ হতে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে তাঁর অনুমতি পত্র আসে৷ সকাল দশটা নাগাদ মেডিক্যাল কলেজ হতে ভর্তির অনুমতিপত্র আসে৷ বিধানচন্দ্র রায় সঙ্গে সঙ্গে ডাকযোগে মানি অর্ডার করে ভর্তি ফি কলকাতায় পাঠিয়ে দিলেন৷ ঠিক বিকেল চারটে নাগাদ আসে বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ হতে ভর্তির অনুমতিপত্র৷ বিধানচন্দ্র রায় মেডিক্যাল কলেজেই ভর্তি হলেন৷ ভাগ্যগুণেই হয়ত তাঁর শিক্ষাজীবনে এমন ঘটনা ঘটল৷ ফলে ভাবীকালে তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব হতে পেরেছিলেন৷ ছাত্র জীবনে তিনি ট্যাক্সি চালিয়ে উপার্জন করেছেন এবং পুরুষ নার্স হিসাবেও দায়িত্ব পালন করে উপার্জন করে লেখাপড়ার খরচ যুগিয়েছেন। তিনি ১৯০৬ সালে কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হতে ফাইনাল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিদ্যায় গ্রাজুয়েট হলেন(১৮৩৫সালে ভারতের গভর্ণর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিংক প্রতিষ্ঠিত কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হচ্ছে ভারতের তথা এশিয়ার প্রথম মেডিক্যাল কলেজ যা ইংরেজগণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন)৷ ওই বছরই তিনি বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল মেডিকেল সার্ভিসে সহকারী চিকিৎসক পদে নিযুক্ত হন। তিনি পরে মেডিক্যাল কলেজে হাউস সার্জন হিসেবে কাজ করেন। সেই সাথে তাঁর চিকিৎসা ব্যবসাও শুরু হয়৷ ওই সময় তিনি রোগীদের কাছ থেকে ফি বাবদ মাত্র দুটাকা নিতেন৷ ডাক্তার হিসেবে তার দক্ষতা, হাত যশ ও রোগীর প্রতি তার অসামান্য মমত্ববোধ অতি শীঘ্রই ডাক্তার হিসাবে তাঁকে অতি জনপ্রিয় করে তুলে। দুবছরের অর্জিত অর্থকে সম্বল করে তাঁর বিলাত গমন সহজ হয়৷ বিধানচন্দ্র রায়ের সামগ্রিক গুণাবলী প্রকাশ ও বিকাশের সুযোগ করে দিয়েছিলেন তাঁর অত্যন্ত হিতৈষী ও গুণগ্রাহী অধ্যক্ষ ডাক্তার কর্ণেল লিউকিসই৷ বিধানচন্দ্র রায় তাঁর উত্তরণের পথে ডাক্তার কর্ণেল লিউকিসই-এর ভূমিকা বার বার শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করেছেন৷
ডাক্তার কর্ণেল লিউকিসই-এর অনুপ্রেরণায় ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ২২শে ফেব্রুয়ারি তিনি বিলাত যাত্রা করেন। এম.আর.সি.পি ও এফ.আর.সি.এস ডিগ্রি লাভের জন্যে বিলাতে পৌঁছে মে মাসে তিনি সেন্ট বার্থোলোমিউজ মেডিক্যাল কলেজে (St Bartholomew’s Hospital in London ) ভর্তি হওয়ার জন্য দরখাস্ত দিলেন। এশিয়ান ছাত্র বিধায় সেবার কলেজের ডীন তার আবেদন গ্রহণ করেন নি। তিনি তাতে দমে যান নাই। তিনি একের পর এক আবেদন করতেই থাকেন। পরপর ৩০বার আবেদন পত্র জমা দেওয়ার পর ডীন অবশেষে তা গ্রহণ করেন। তিনি সেখানে ভর্তি হন। অত্যন্ত নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সাথে সেখানে অধ্যয়ন করে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে তিনি এক সাথে এম.আর.সি.পি (লন্ডন) ও এফ.আর.সি.এস (লন্ডন) ডিগ্রি লাভ করেন৷একসাথে দুটো ডিগ্রি লাভ সচরাচর ঘটে না। এম.আর.সি.পিতে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান ব্যক্তিদের সমীহ আদায় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। একজন ভারতীয় তথা বাঙালি হিসেবে তাঁর এই সাফল্যে অনেকে বিস্মিত হয়েছিলেন৷ এরপর তিনি স্বদেশে ফিরে এসে কলকাতার ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুল ও হাসপাতালে সহকারী সার্জন ও শিক্ষকের পদে যোগদান করেন৷ ক্যাম্বেলে থাকাকালীন তিনি এর সামগ্রিক উন্নতি সাধন করেছিলেন৷ ১৯১১ সালে তিনি যখন বিলেত থেকে কলকাতায় ফিরলেন তাঁর হাতে তখন ছিল মাত্র ৫টাকা। বিলেত যাবার আগে কলকাতায় বিধানচন্দ্র রায়ের ফি ছিল ২টাকা। মাত্র সাড়ে আট বছরের প্র্যাকটিসে কলকাতায় প্রাসাদোপম বাড়ি এবং গাড়ির মালিক হইয়েছিলেন তিনি। তাঁর কাজের কারণে তিনি সর্বস্তরের মানুষের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন৷ ওই বছরই অর্থাৎ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের ৭ই ডিসেম্বর প্রায় ৬৪ বছর বয়সে তাঁর পিতা প্রকাশচন্দ্র রায় লোকান্তরিত হন৷
তিনি ১৯১৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য নির্বাচিত হন৷ তিনি নিষ্ঠা ও গভীর প্রত্যয়ের সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ পদের দায়িত্ব পালন করেছিলেন৷ এই বছরই তিনি পদ্মা খাস্তগীরের কাছ হতে ৩৬নং ওয়েলিং স্ট্রিটের একটি বাড়ি ক্রয় করেন৷ ওই বাড়িতেই তিনি সমাজের দুঃস্থ ও আর্থিক দিক থেকে দুর্বল রোগীদের মল,মূত্র, কফ পরীক্ষার জন্য একটি ল্যাবরেটরী স্থাপন করেছিলেন৷
ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সৃষ্টিশীল মন, সৃজনশীল ভাবনা ও তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে কোনো প্রতিষ্ঠানে বা ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন বন্দি থাকতে দেয়নি৷ তারই ফলশ্রুতিতে ১৯১৯ সালে সরকারী চাকরি ত্যাগ করে তিনি কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপকের পদগ্রহণ করেন৷ প্রথমে এটি একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ছিল। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি বা মঞ্জুরি পাওয়ার পর এটি পূর্ণাঙ্গ মেডিক্যাল কলেজে উন্নীত হয়৷ এর পিছনে ডা. রায়ের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল৷
কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে অধ্যাপনার শুরুতে শ্রেণিকক্ষে ডা. রায় বিদ্যার্থীগণকে বুঝিয়ে দিতেন কি কি গুণ থাকলে একজন আদর্শ চিকিৎসক হওয়া যায়৷ চিকিৎসা বৃত্তি যে একটি মহৎ পেশা তা ব্যক্তি বা চিকিৎসককে সর্বদা মনে রাখতে হবে৷ সেই বৃত্তি বা পেশায় সাফল্য নির্ভর করে চিকিৎসকের কোমল হৃদয়, তার মমত্ববোধ ধৈর্যশীল প্রকৃতি ও সমবেদনার উপর৷ এই প্রসঙ্গে ডা. রায় তাঁর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক কর্ণেল ডা. লিউকিসই এর কাছ হতে যে আদর্শবাণী পেয়েছিলেন তা ছাত্রদের শোনাতেন-
এমন একটি হৃদয়
কঠোর হয় না সে কভু,
এমন একটি প্রকৃতি
বিরাম চায়না সে কভু
এমন একটি পরশ
বেদনা দেয় না সে কভু৷

এই বাণী যাতে ছাত্রদের মনে গভীরভাবে রেখাপাত করে ও ছাত্ররা সহজে আত্মস্থ করতে পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে তিনি একটি সুন্দর বোর্ডে বড় বড় হরফে লিখে তা শ্রেণিকক্ষের প্রবেশ দ্বারে রেখে দিলেন৷ এইভাবে শত বিদ্যার্থী ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের উদার ভাবনা, দরদ ও পথ নির্দেশনায় সমৃদ্ধ হয়ে পরবর্তী জীবনে এই বৃত্তিকে মহৎ পেশা হিসেবেই আন্তরিকভাবে গ্রহণ করে তার মর্যাদা রাখতে প্রয়াসী হয়েছেন৷কথিত আছে তিনি নাকি রোগীর মুখ দেখেই রোগ নির্ণয় করে দিতে পারতেন।
তারপর ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায় শুরু হলেও তাঁর ভাবনায় ছিল তিনি প্রথমে চিকিৎসক পরে রাজনীতিবিদ৷ ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে দেশবন্ধুর কাছে তিনি রাজনৈতিক দীক্ষা লাভ করেন। এই রাজনৈতিক জীবনও ছিল তাঁর কাছে বর্ণময়, ছন্দময় ও কর্মময়৷ ভারতবর্ষের আপামর মানুষ কালজয়ী চিকিৎসক ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে রাজনীতিক বিধানচন্দ্র রায় হিসেবে দেখতে শুরু করলেন৷ এই অধ্যায়েও তিনি কিংবদন্তি হয়ে উঠলেন৷ জাগতিক জীবনে একজন মানুষের শ্রমশীলতা, দেশপ্রেম, মানবপ্রেম একজন মানুষকে কতটা পূর্ণতা দান করতে পারে তা দেখা গেল ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের রাজনৈতিক জীবনে৷ সুদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তাঁর কাছে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ছিল প্রথমে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ পরে মহাত্মা গান্ধী ৷ এই দুই উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব তাঁর পথ প্রদর্শক ছিলেন৷ ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দের ৩০শে নভেম্বর সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে প্রতিযোগিতায় পরাজিত করে উত্তর ২৪ পরগনা মিউনিসিপ্যাল অনুসন্ধান নির্বিচকমন্ডলী কর্তৃক স্বতন্ত্র প্রার্থী রূপে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হলেন৷ তারপর কর্মতৎপরতা ও অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে তিনি উক্ত পদের মর্যাদা রক্ষা করেছিলেন৷
তারপর ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি স্বরাজ্য দলে যোগদান করেন৷ বাজেট অধিবেশনে মার্চ মাসে রোগসজ্জায় শায়িত দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশকে নিয়ে তিনি ব্যবস্থাপক সভায় যোগদান করলেন৷ এরপর ১৬ই জুন আকশ্মিকভাবে দেশবন্ধুর দেহান্তর ঘটে৷ দেশবন্ধু সম্পাদিত ট্রাস্ট-এ মনোনীত হয়ে বিধানচন্দ্র রায় চিত্তরঞ্জন সেবাসদন প্রতিষ্ঠা করলেন ও নিজে তার সম্পাদক নির্বাচিত হলেন৷ ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তৃতীয়বার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফেলো নির্বাচিত হলেন৷ মহাত্মা গান্ধীর ডাকে তিনি কংগ্রেসে যোগদান করে ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে কারাবরণ করেন। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট পরাধীনতার অক্টোপাস হতে ভারত মুক্তি লাভ করল৷ একদিকে স্বাধীনতা প্রাপ্তির আনন্দ অন্যদিকে ভারত বিভাজনের বিষাদ অনেকের মতো তাঁর মনকে যেন আচ্ছন্ন করেছিল৷ বিভক্ত বাংলার পশ্চিমবঙ্গের পাহাড় প্রমাণ সমস্যা রাজ্যবাসীকে যেন গ্রাস করে ফেলল৷
দেশ স্বাধীন হবার পর উত্তরপ্রদেশের রাজ্যপাল হবার জন্য ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়কে তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু প্রস্তাব দেন। তখন তার চোখের চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। তাঁর পরিবর্তে রাজ্যপাল হলেন বিক্রমপুরের লৌহজংয়ের কনকসার গ্রামের মেয়ে নাইটিঙ্গেল অফ ইন্ডিয়া হিসাবে খ্যাত সরোজিনী নাইডু(১৮৭৯-১৯৪৯)। পশ্চিমবঙ্গের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন ড. প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষ(১৮৯১-১৯৮৩)। ঢাকার নবাবগঞ্জের কৈলাইল ইউনিয়নের মালিকান্দা গ্রামের সন্তান দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপোষহীন ড. প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ ছিলেন সৎ ও আদর্শবান মানুষ। মূলত শিল্পপতিদের সিন্ডিকেট তাঁকে পছন্দ না করায় তিনি মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যেতে বাধ্য হন(অবশ্য পরে আরও দুবার তিনি মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন)। পশ্চিমবঙ্গের আইন সভার সদস্যগণ তখন একবাক্যে ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে দলনেতা নির্বাচন করেন। তিনি নির্বাচিত হলেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দ্বিতীয় মুখ্যমন্ত্রী পদে। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস দলের প্রতিনিধিত্বে ১৯৪৮ সালের ১৪ই জানুয়ারি থেকে মৃত্যুকাল অবধি ১৪ বছর তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন।তিনি যখন মুখ্যমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করলেন তার আগের মাসেও ডাক্তারি থেকে তাঁর আয় ছিলো ৪২,০০০টাকা অথচ মুখ্যমন্ত্রী হয়ে নিজেই নিজের মাইনে ঠিক করলেন মাত্র ১,৪০০টাকা।দ্বিতীয়বার মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি দেশের বন্যা নিয়ন্ত্রণ চাষাবাদে আশাতীত উন্নতি সাধনের জন্যে পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার কাজ আরম্ভ করলেন। পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্যে তিনি নানাবিধ উন্নয়ন কাজ শুরু করলেন৷ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক ইচ্ছায় গড়ে উঠেছিল রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ, পুরুলিয়া, রহড়া, নরেন্দ্রপুরে প্রাচীন ভারতীয় আদর্শে আশ্রমিক পরিবেশে রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যালয়।
বর্ধমানের দুর্গাপুরে একটি বৃহৎ শিল্পকেন্দ্র স্থাপনের জন্যে তিনি তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহরুকে একটি সুপরিকল্পিত প্রস্তাব পাঠান৷ তিনি দুর্গাপুরে একট কোক-চুল্লি কারখানা, একটি বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদন কেন্দ্র ও একটি বৃহৎলৌহ ও ইস্পাত তৈরির কারখানা প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে স্থাপন করলেন৷ এই শিল্প নগরীতে কয়েক হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান হয়েছিল৷ তিনি ছিলেন চিরকুমার।
তখনকার ভারত বিখ্যাত টিকিৎসক ড. নীলরতন সরকারের ছিল ছয় সন্তান(পাঁচ কন্যা ও এক পুত্র)। তাঁর কন্যা কল্যাণী সরকারকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিয়েছিলেন বিধানচন্দ্র রায়। সে সময়ে নতুন ডাক্তারিতে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের আয় ছিল কম। বিয়ের প্রস্তাব পেয়ে ড. নীলরতন সরকার বলেছিলেন যে কল্যাণীর একদিনের খরচের পয়সাই তো বিধানচন্দ্র মাসে আয় করতে পারে না। ফলে প্রেয়সী কল্যাণী সরকারের সাথে বিধানচন্দ্র রায়ের আর বিয়ে হয়নি। তিনি আর কোনো দিনই বিয়ে করেননি, রয়ে গেলেন চিরকুমার। তিনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে দ্বিতীয় কলকাতা শহর তৈরির পরিকল্পনা করেন। স্থান নির্বাচন করলেন নদীয়া জেলার পশ্চিম-দক্ষিণে ভাগীরথী নদীর বাম তীরের একটি মনোরম স্থান। তিনি স্থানটির নাম দিলেন প্রেয়সীর নামে কল্যানী। উল্লেখ, স্যার নীলরতন সরকার ( ১৮৬১ – ১৯৪৩ ) ছিলেন একজন বিখ্যাত চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ। দক্ষিণ ২৪ পরগণা জেলার নেত্রাতে ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১লা অক্টোবর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের যশোহর জেলার মনিরামপুর উপজেলার ঝাঁপা ইউনিয়নের দয়াপুর গ্রামে।তাঁর পিতার নাম নন্দলাল সরকার। নন্দলাল সরকার যশোরের একটি দরিদ্র কায়স্থ পরিবারের মানুষ ছিলেন। তিনি পরবর্তী কালে দক্ষিণ ২৪ পরগনার জয়নগরে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। বিখ্যাত শিশুসাহিত্যিক যোগীন্দ্রনাথ সরকার ছিলেন নীলরতন সরকারের অনুজ। নীলরতন সরকার পূর্ববঙ্গের ব্রাহ্ম ধর্ম প্রচারক গিরিশচন্দ্র মজুমদারের মেয়ে নির্মলা মজুমদারকে ১৮৮৮ খ্রিস্টাব্দে বিয়ে করেন। তিনি বহু শিক্ষাসংস্থা এবং গবেষণামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এগুলি স্থাপনে সহযোগিতা করেছিলেন। তিনি একজন সক্রিয় রাজনীতিবিদ ছিলেন এবং শিল্পস্থাপনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছিলেন।
কল্যাণী নদিয়া জেলার কল্যাণী মহকুমার প্রশাসনিক কেন্দ্রও বটে। রাজধানী কলকাতা থেকে এর দূরত্ব মাত্র্ ৫০ কিমি। কলকাতার পরে এটি একটি উল্লেখযোগ্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত। এছাড়া ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের পরিকল্পনা ছিল কল্যাণীকে দ্বিতীয় কলকাতা হিসাবে তৈরি করা। ট্রেনে শিয়ালদহ থেকে কল্যাণী সীমান্ত, রাণাঘাট, কৃষ্ণনগর, শান্তিপুর, গেদে লোকালে ও লালগোলা প্যাসেঞ্জার ট্রেনে কল্যাণী রেলওয়ে স্টেশন পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়। কল্যাণী সীমান্ত লোকাল ব্র্যাঞ্চ লাইনে শহরের মধ্য দিয়ে কল্যাণী শিল্পাঞ্চল ও কল্যাণী ঘোষপাড়া হয়ে কল্যাণী সীমান্ত স্টেশন অবধি যাচ্ছে। সমগ্র ভারতের মধ্যে একমাত্র পশ্চিমবঙ্গের কল্যাণীতে একই শহরের ভেতর ৫ কিলোমিটারের মধ্যে আছে ৪ টি রেল স্টেশন। সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যবস্থা ও কল্যাণীকে একটি শিল্প নগরী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিধানচন্দ্র রায় মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে কেন্দ্রীয় সরকারকে এই রেল রুট চালু করার প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন ।
কিন্তু তার অকাল প্রয়াণে সেই কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয়নি। এছাড়া এয়ারপোর্ট অথরিটির পরিকল্পনা অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখানে হওয়ার কথা। আপাতত জমি জটে এই কাজ বন্ধ আছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই স্থানে ছিল একটি আমেরিকান বিমান ঘাঁটি। সে সময়ে এর নাম ছিল রুজভেল্ট নগর। ১৯৫০ এর দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে কল্যাণীকে একটি আদর্শ পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। ১৯৫৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের অধিবেশনও এই শহরে অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক অধিবেশনের স্মৃতিস্বরূপ কল্যানী শহরের একটি রাস্তার নামকরণ করা হয় কংগ্রেস রোড।
নদীয়া জেলার কল্যাণী মহকুমা পশ্চিমবঙ্গের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র্। কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয় ও বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়- এই দুটি বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, জে আই এস কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং, আইডিয়াল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং, গয়েশপুর গভঃ পলিটেকনিক কলেজ, কলেজ অফ মেডিসিন অ্যান্ড জে.এন.এম হসপিটাল, কল্যাণী মহাবিদ্যালয় (কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্গত একটি স্নাতক কলেজ), স্নেহাংশুকান্ত আচার্য আইন কলেজ, একটি ডেয়ারি রিসার্চ ইনস্টিটিউট, ন্যাশনাল হোমিওপ্যাথি ইনস্টিটিউট, ইন্ডিয়ান সায়েন্স, রিসার্চ ইন্সটিটিউট, একটি কারিগরী শিক্ষাকেন্দ্র (ITI) মোট ২টি বিশ্ববিদ্যালয় সহ মোট ১১ টি কলেজ এবং ১ টি মেডিকেল কলেজ ও ৩ টি গবেষণা কেন্দ্র, এছাড়াও অসংখ্য সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত বেসরকারী স্কুল কল্যাণীকে পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের একটি বিশিষ্ট শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত করেছে।
যে সল্টলেক বা লবণহ্রদে একদিন নিরন্তর ঝিঁঝিঁ পোকা আর শিয়ালের ডাক শোনা যেত এমন অনুন্নত স্থানকে তিনি সরকারী কার্যালয়, আবাসন ও ক্ষুদ্র শিল্পের ক্ষেত্র তৈরি করলেন৷ দীঘাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসাবে আকর্ষণীয় করে তুললেন৷ বক্রেশ্বরকে নানাভাবে সাজিয়ে তুললেন৷ খড়গপুরে আই.আই.টি শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভূমিকা গ্রহণ করলেন৷ পশ্চিমবঙ্গে কৃষির উন্নয়নের পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা রচনা করলেন৷ পশ্চিমবঙ্গের সাথে বিভিন্ন রাজ্যের যোগাযোগ স্থাপনের জন্য সরকারী বাস বা পরিবহনের ব্যবস্থা করলেন৷
তিনশ কোটি টাকা সংগ্রহ
মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় সূচিত পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি নতুন শহর কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি বা কেএমডিএ-এর আওতায় এনে উন্নয়নের কাজ ত্বরান্বিত করা হচ্ছে। অথচ এই পাঁচটি শহর উন্নয়নের জন্য সে সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডীর(১৯১৭-৬৩) নিকট থেকে তিনশ কোটি টাকা সংগ্রহের তাঁর পদক্ষেপের বিষয়টি খুবই চমকপ্রদ। তাঁর মৃত্যুর আড়াই বছর আগে ডা. বিধানচন্দ্র রায় আমেরিকা ভ্রমণে গেলেন।তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে আমেরিকার এক কোম্পানির সাথে চুক্তি স্বাক্ষর ত্বরান্বিত করাসহ পশ্চিমবঙ্গের নানা উন্নয়ন প্রকল্পে মার্কিন সহায়তা লাভ ছিল আমেরিকা ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য। ওয়াশিংটনে পৌঁছে আমেরিকায় ভারতের রাষ্ট্রদূতকে বললেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডীর সাথে তার সাক্ষাতের ব্যবস্থা করার জন্য। রাষ্ট্রদূত ডা. বিধানচন্দ্র রায়কে জানালেন ভারতের রাজ্যের একজন মুখ্যমন্ত্রীর সাথে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সাক্ষাতের বিষয়টি প্রোটোকলে পরে না। বিধান বাবু রাষ্ট্রদূতকে বললেন তোমার প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলাপ কর। তিনি আলাপ করলেন। দিল্লী থেকে ইতিবাচক নির্দেশ পেয়ে রাষ্ট্রদূত তৎপর হলেন। তিন দিনের মধ্যেই প্রেসিডেন্ট কেনেডীর সাথে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের আধ ঘন্টার একটি সাক্ষাতের ব্যবস্থা হলো।ভারতের সাথে মার্কিন সম্পর্ক, চলমান উন্নয়ন প্রকল্প ইত্যাদি নিয়ে আন্তরিক পরিবেশে আলাপ শেষে ডা. বিধানচন্দ্র রায় প্রেসিডেন্টকে বললেন, আমি শুনেছি আপনি অনেক দিন ধরে পিঠের একটি ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন।এখন ওটার অবস্থা কি? প্রেসিডেন্ট চমকে উঠলেন। বললেন, আপনি জানলেন কেমন করে? বিধান রায় বললেন, আমি পেশায় চিকিৎসক আর নেশায় পলিটিশিয়ান। এখানে আসার আগে আমি সব জেনে এসেছি। প্রেসিডেন্ট স্বীকার করলেন। ডা. বিধান রায় তাঁর পিঠের ব্যথার চিকিৎসা করতে আগ্রহ প্রকাশ করলে প্রেসিডেন্ট তাঁর সব ব্যবস্থাপত্র ডা. বিধান রায়কে দেখালেন। তিনি দেখলেন এযাবৎ করা চিকিৎসায় কিছু ত্রুটি রয়েছে। সেখানে থাকা স্টেথোস্কোপ ত্রুটিপূর্ণ পাওয়ায় হাত দিয়ে অনুভব করে বিধান বাবু নিজে নতুন করে ব্যবস্থাপত্র দিলেন এবং বললেন এতে যদি না সারে তাহলে নিজ খরচে আবার তিনি আসবেন। প্রেসিডেন্ট খুশি হলেন। উঠে আসার সময় ডা. বিধানচন্দ্র রায় হাসতে হাসতে বললেন সবইতো হলো কিন্তু চিকিৎকের ফি তো পাওয়া গেল না। প্রেসিডেন্টও হাসতে হাসতে বললেন আপনার ফি কতো? ডা. বিধানচন্দ্র রায় বললেন আমার ফি তিনশ কোটি টাকা। তিনি বললেন আমার রাজ্যে অনেক কাজ চলমান কিন্তু টাকা নাই। যদি আপনি সহায়তা করেন তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ গুলো সম্পন্ন করা যায়। প্রেসিডেন্ট এক কথায় রাজি হয়ে গেলেন। বললেন দেশে ফিরে আপনার প্রধানমন্ত্রীকে গিয়ে বলুন চিঠি দিতে।
আমেরিকা থেকে দেশে ফিরে তিনি অর্থমন্ত্রী মোরারজী দেশাইকে বললেন পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য অর্থ চেয়ে সরাসরি আমেরিকায় চিঠি পাঠাতে। ভারতের সবচেয়ে বেশি বার(১০বার) বাজেট পেশকারী অর্থমন্ত্রী মোরারজী দেশাই (১৮৯৬-১৯৯৬) একটি রাজ্যের উন্নয়নের জন্য অর্থ চেয়ে চিঠি দিতে রাজি হলেন না। তখন ডা. বিধান রায় পন্ডিত জওহরলাল নেহরুকে বললেন। নেহরু অর্থমন্ত্রীকে বললেন, বিধানচন্দ্র রায়কে ঘাটাইও না, করে দাও কাজ। চিঠি পাঠানো হলো। তিন মাসের মধ্যে চলে আসলো তিনশ কোটি টাকা। ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের মৃত্যুর আড়াই বছর আগে এরূপ একটি বিশাল কাজ করে গেলেন পশ্চিমবঙ্গের উন্নয়নের জন্য এটা ভাবলেও অবাক হতে হয়।
দুর্গাপুর ইস্পাতনগরী, চিত্তরঞ্জন রেল ইঞ্জিন কারখানা, কল্যাণী উপনগরী, লেক টাউন, লবণহ্রদ নগর, হরিণঘাটা দুগ্ধপ্রকল্প, কোলকাতা রাষ্ট্রীয় সংস্থাসহ পশ্চিমবঙ্গের নানা উন্নয়ন কাজ দেখানোর জন্য পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু কলকাতায় নিয়ে এসেছেন একে একে সোভিয়েত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকিতা ক্রুশ্চেভ, চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই, মিসরের প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুকর্ণকে। প্রধানমন্ত্রী পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু বিদেশী এরূপ অতিথিদের কাছে গর্ব করেই বলতেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়ই আমার নেতা।
স্বল্প পরিসরে ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের চিকিৎক জীবনের নানা মধুর অভিজ্ঞতার ঘটনা বর্ণনা করা সম্ভব নয়। বার্মা তথা মায়ানমার থেকে বেলুচিস্তান অবধি ছিল তাঁর রোগীর আওতা। তাঁর রোগীর তালিকায় সাধারণ মানুষ ছাড়াও মতিলাল নেহরু, কমলা নেহরু, মহাত্মা গান্ধী, জওহর লাল নেহরু, বল্লভ ভাই প্যাটেল, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইন্দিরা গান্ধীসহ অনেকেই ছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বাড়িতে বিনা পয়সায় নিয়মিত রোগী দেখতেন সকাল সাতটায়। এবং তার জন্য দু’জন ডাক্তারকে নিজের পয়সায় নিয়োগ করেছিলেন। ব্যক্তিগত স্টাফের মাইনে দিতেন নিজের পকেট থেকে। ভোর ৫টায় উঠে গীতা ও ব্রহ্মস্তোত্র পাঠ করে, স্নান সেরে, সাড়ে ৬টায় ব্রেকফাস্ট খেয়ে, ২ঘণ্টা ধরে বিনামূল্যে রোগী দেখে ডা. রায় রাইটার্স বিল্ডিংস-এ যেতেন। ডা. রায়ের প্রভাবে রাইটার্সের বড় বড় অফিসাররাও অভ্যাস পাল্টালেন, নিয়ম শৃঙ্খলা শিখলেন। শোনা যায় তার আগে রাইটার্সের ‘বাবুরা’ ১১টার আগে অফিসে হাজিরা দিতেন না।
বাংলা সাহিত্য ও সিনেমার ক্ষেত্রেও একাধিক উপকার তিনি করেছিলেন। বান্ধবী বেলা সেনের কথায়, সত্যজিৎ রায়ের অসমাপ্ত ছবি বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘পথের পাঁচালী’ তিনি দেখেন এবং সরকারি নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে এই ছবিটির সরকারি প্রযোজনার ব্যবস্থা করেন। লেখকদের লেখার স্বাধীনতার দিকটা তিনি দেখতেন।
১৯৬২ সালের ১লা জুলাই চলে গেলেন ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ১ জুলাই জন্মদিনেই তাঁর তিরোধান দিবস। ১১টা ৫৫ মিনিটেই হয় তাঁর অনন্ত যাত্রা। নিজের অর্থবিত্ত, বাড়িঘর তথা সহায় সম্পদ জনগণের জন্য আগেই বিলিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।
দুঃসংবাদ পৌঁছাল দেশবন্ধুর স্ত্রী বাসন্তীদেবীর কাছে। ডা. বিধান রায়ের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি বললেন-‘ বিধান পুণ্যাত্মা, তাই জন্মদিনেই চলে গেল। ভগবান বুদ্ধও তাঁর জন্মদিনে সমাধি লাভ করেছিলেন।’ দেহাবসানের কয়েক বছর আগে কেওড়াতলা শ্মশানের বৈদ্যুতিক চুল্লির সূচনা করতে এসে ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায় বলেছিলেন, ‘ওহে তোমরা আমাকে এই ইলেকট্রিক চুল্লিতে পোড়াবে।’ ১৯৬২ সালের ২রা জুলাই তারিখে তাঁর সেই ইচ্ছা পূর্ণ করা হয়েছিল।

-জয়নাল হোসেন
লেখক ও গবেষক।
০২.০৮.২০২০

-Advertisement-
Recent  
Popular  

Our Facebook Page

-Advertisement-
-Advertisement-